বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের পর পর্তুগাল জাতীয় দলে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন অধ্যায়। রবার্তো মার্তিনেজের বিদায়ের পর দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন অভিজ্ঞ পর্তুগিজ কোচ হোর্হে জেসুস। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো না এলেও পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলসংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ৭১ বছর বয়সী এই কোচের নিয়োগ প্রায় চূড়ান্ত।
ইতালিয়ান সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানোও তার পরিচিত ‘Here we go!’ বার্তার মাধ্যমে জেসুসের নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইএসপিএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ) সপ্তাহের শেষ নাগাদ নতুন কোচের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে চায় এবং হোর্হে জেসুসই তাদের প্রথম পছন্দ।
স্পেনের কাছে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ১-০ গোলে হারের পর সমালোচনার মুখে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব ছাড়েন রবার্তো মার্তিনেজ। এরপরই নতুন কোচ খুঁজতে দ্রুত কাজ শুরু করে এফপিএফ।
ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েঞ্চা বলেন, নতুন কোচ এমন একজন হতে হবে, যিনি পর্তুগিজ ফুটবলের সংস্কৃতি ভালোভাবে বোঝেন এবং জাতীয় দলের জয়ের মানসিকতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। তার মতে, বিশ্বকাপে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখন সামনে নেশনস লিগ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
পর্তুগিজ ফুটবলে ‘জেজে’ নামে পরিচিত হোর্হে জেসুস দেশের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে বিবেচিত। তার হাত ধরেই দীর্ঘ এক দশক পর আবারও প্রিমেইরা লিগের শিরোপা জেতে বেনফিকা। ক্লাবটির হয়ে তিনি তিনটি লিগ শিরোপাসহ মোট ১০টি ট্রফি জিতেছেন এবং দুটি ইউরোপীয় ফাইনালে দলকে তুলেছেন।
পরবর্তীতে ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গোতে যোগ দিয়ে মাত্র এক মৌসুমে কোপা লিবার্তাদোরেস, ব্রাজিলিয়ান লিগসহ পাঁচটি শিরোপা জেতান। এরপর সৌদি আরবের আল হিলালকে ঘরোয়া ট্রেবল উপহার দেন। সবশেষে আল নাসরের দায়িত্ব নিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে কাজ করেন এবং ক্লাবটিকে রোনালদোর যোগ দেওয়ার পর প্রথম লিগ শিরোপা এনে দেন। গত মে মাসে আল নাসর ছাড়ার পর থেকে তিনি নতুন দায়িত্বের অপেক্ষায় ছিলেন।
জেসুসের কোচিং দর্শনও রবার্তো মার্তিনেজের তুলনায় ভিন্ন। মার্তিনেজ যেখানে শান্ত ও কৌশলী আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন, সেখানে জেসুস স্পষ্টভাষী, আবেগপ্রবণ এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের প্রবক্তা। টাচলাইনে দাঁড়িয়ে খেলোয়াড়দের নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোও তার স্বভাবসুলভ আচরণ।
জাতীয় দলে তার নিয়োগের সবচেয়ে আলোচিত দিক অবশ্য ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভবিষ্যৎ। বিশ্বকাপের আগে রোনালদো ঘোষণা দিয়েছিলেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেননি তিনি। ফলে ২০২৮ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তার খেলার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।
জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্ক বেশ ইতিবাচক। আল নাসরে একসঙ্গে কাজ করার সময় জেসুস একাধিকবার রোনালদোর নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছিলেন। সে কারণে অনেকের ধারণা, জাতীয় দলেও তার অধীনে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আরও কিছুটা দীর্ঘ হতে পারে।
বর্তমান পর্তুগাল দলের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারের সঙ্গেও আগে কাজ করেছেন জেসুস। তার অধীনেই ব্রুনো ফার্নান্দেজ নিজেকে অনন্য পর্যায়ের মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আল নাসরে তার অধীনে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান জোয়াও ফেলিক্সও।
তবে সব সম্পর্ক যে ইতিবাচক, তা নয়। অতীতে বার্নার্দো সিলভার সঙ্গে জেসুসের প্রকাশ্য মতবিরোধ হয়েছিল। ফলে জাতীয় দলে দুজনের সমন্বয় কেমন হবে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া জোয়াও কানসেলো, রুবেন দিয়াজ, রুবেন নেভেস, তোমাস আরাউজো, গনজালো রামোস, গনজালো গেদেস এবং রাফায়েল লেয়াঁওর মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গেও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে জেসুসের।
ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত হোর্হে জেসুসকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে এবং নতুন কোচের অধীনে নেশনস লিগকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করবে পর্তুগাল।
নতুন কোচ, নতুন দর্শন এবং পরিচিত কিছু খেলোয়াড়কে নিয়ে পর্তুগাল আবারও বড় শিরোপার লড়াইয়ে ফিরতে চায়। আর সেই নতুন যাত্রায় সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখনো শেষ হয়নি বলেই মনে করছেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক।