এস্তাদিও সেন্তেনারিও, উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদেওতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ফুটবল স্টেডিয়াম। এখানেই প্রথম বিশ্বকাপের খেলাগুলো হয়েছিল। সেই যে শুরু, আজও থামেনি তার গড়িয়ে যাওয়া। গড়াতে গড়াতে আজ ২০২৬ সালে এসে পৌঁছেছে। ফুটবলময় হয়ে উঠেছে সারা বিশ্ব। বিশ্ব ফুটবলের কীর্তিমান এক পুরুষের নাম আশরাফ হাকিমি। এখন আমরা তার গল্প শুনবো। বর্তমান ফুটবলের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম আশরাফ হাকিমি। যার গতি আর পায়ের জাদু আজ বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু এই কোটিপতি ফুটবলারের পেছনের গল্পটা কোনো রূপকথার চেয়ে একটুও কম নয়। আশরাফ হাকিমি এমন এক যুবক, তার মায়ের চোখের পানি আর বাবার গায়ের ঘামকে নিজের সাফল্যের জ্বালানি বানিয়েছিলেন। যিনি কোটি টাকার বিলাসবহুল জীবনের চেয়েও মায়ের হাসিকে বেশি মূল্যবান মনে করেন। গল্পের শুরুটা অনেকটা এই রকম….।
আশরাফ হাকিমির জন্মের আগেই উন্নত জীবিকার সন্ধানে মরক্কো থেকে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন তার বাবা-মা। কিন্তু নতুন দেশে টিকে থাকার লড়াইটা ছিল অসম্ভব কঠিন। কনকনে শীতে কিংবা তপ্ত রোদে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঘুরে জিনিসপত্র ফেরি করতেন হাকিমির বাবা। আর তার মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয় সেখানে হাকিমির ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে তারা কখনো জলাঞ্জলী দেননি। নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ছেলের ফুটবল খেলার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, যাতে তার স্বপ্নটা বেঁচে থাকে। এক সাক্ষাৎকারে হাকিমি নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, প্রতিদিন মা-বাবাকে যেভাবে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখতেন, তা তার হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিত। তখনই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যেকোনো মূল্যে বড় ফুটবলার হবেন, যেন মায়ের হাতের সেই ঝাড়ুটা চিরদিনের জন্য কেড়ে নিয়ে তাকে রানীর মতো জীবন দিতে পারেন। স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত যুব একাডেমি লা ফাব্রিকাতে নিজের প্রতিভা আর অবিশ্বাস্য পরিশ্রমের জোরে হাকিমি একসময় জায়গা করে নেন। সেখান থেকেই ধাপে ধাপে উঠে আসেন রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলে। এরপর খেলেছেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, ইন্টার মিলান এবং বর্তমানে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন (পিএসজি)-এর হয়ে। ফুটবল বিশ্ব তাকে দুহাত ভরে দিয়েছে অর্থ, খ্যাতি আর সম্মান। স্পেনেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি বেছে নেন তার বাবা-মায়ের মাতৃভূমি মরক্কোকে। তিনি চেয়েছিলেন, বিশ্বমঞ্চে যখন মরক্কোর পতাকা উড়বে, তখন গ্যালারিতে বসে তার মা যেন গর্বভরে বলতে পারেন- ‘ওই যে মরক্কোর হয়ে খেলছে, ওটা আমার ছেলে!’ পরিশ্রম করলে সব মানুষেরই স্বপ্নপূরণ হয়। হাকিমির স্বপ্নও একদিন পূরণ হয়েছিল। তিনি ২০২২ সালে যুক্ত হলেন কাতার বিশ্বকাপে। মরক্কো যখন একের পর এক পরাশক্তিকে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বে রূপকথা লিখছিল, তখন মাঠের পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে বিশ্ববাসীর হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল অন্য এক দৃশ্য। স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টি থেকে গোল করার পর হাকিমি সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনে মেতে ওঠার আগে সোজা ছুটে গিয়েছিলেন গ্যালারির দিকে, যেখানে বসে ছিলেন তার মা। হাকিমি গ্যালারির কাছে পৌঁছাতেই মা পরম মায়ায় ছেলের মুখটা দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন, ঠিক যেভাবে ছোটবেলায় মাদ্রিদের ধুলোমাখা ছেলের মুখ মুছে দিতেন। হাকিমি মায়ের কপালে গভীর ভালোবাসার একটি চুমু আঁকলেন, আর মা তাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন। সেই দৃশ্য দেখে বিশ্ববাসী উপলব্ধি করেছিল, একজন সফল মানুষের পেছনে একজন মায়ের ত্যাগ কতটা অসীম হতে পারে। গৃহকর্মী মায়ের সেই ছেলেটিই আজ শুধু মরক্কোর নয়, পুরো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও অনুপ্রেরণার নাম।