মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ন

পাঁচ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য সরকারের

প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশের সময়ঃ মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২০ বার পঠিত হয়েছে
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর। ফাইল ছবি

আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি বাংলাদেশির জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, ব্যাপক দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন ব্যয় কমানো, অভিবাসন সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং প্রবাসী কর্মীদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাড়ানোর মাধ্যমে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ রোডম্যাপ তুলে ধরেন।

মধ্যপ্রাচ্যের গতানুগতিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশে অভিবাসনকে আরও স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী ও দক্ষতাভিত্তিক করার কথাও বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার হলো পাঁচ বছরে এক কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আমরা এরই মধ্যে সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ শুরু করেছি।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে চাহিদার পূর্বাভাস সংগ্রহ করেছে। সেখানে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ বিদেশি কর্মীর চাহিদা চিহ্নিত হয়েছে। এ চাহিদাই লক্ষ্য অর্জনের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের কাজ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে তাদের বিদেশের ওই সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা। আমার বিশ্বাস, অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল করে পাঁচ বছরের মধ্যেই আমরা এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।’

নুর জানান, বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কাজের জন্য বিদেশে যান। আরও দক্ষ কর্মী তৈরি করে সরকার ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং প্রবাসী কল্যাণ জোরদার করা; এই চারটি প্রধান অগ্রাধিকারের ওপর সরকারের অভিবাসন সংস্কার কৌশল দাঁড়িয়ে আছে।

তিনি জানান, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দালালের ওপর অপ্রয়োজনীয় নির্ভরতা কমাতে বিদেশগমন প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই প্রবাসী কর্মীরা যেন এক জায়গা থেকেই সব সেবা পান। হয়রানি কমানো, প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য বিদেশ যাওয়া সহজ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

নুর বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের খরচ কমাতে সরকার দেশভিত্তিক অভিবাসন ব্যয় কাঠামো চালুর পরিকল্পনাও করেছে। একই সঙ্গে সরকার এখন অদক্ষ অভিবাসনের বদলে দক্ষতাভিত্তিক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

বিশ্ব শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদা মাথায় রেখে দেশের ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে (টিটিসি) আধুনিক করছে মন্ত্রণালয়। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতায় সক্ষম কর্মী তৈরি করা।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষতা ছাড়া বিদেশে চাকরি পাওয়া বা টিকে থাকা এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই দক্ষতা উন্নয়ন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

বাংলাদেশ প্রশিক্ষিত কর্মীদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজও তৈরি করছে। এর মাধ্যমে বিদেশি নিয়োগকর্তারা পেশার চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি প্রার্থী বাছাই করতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের যদি ১০ হাজার জাহাজ নির্মাণ শ্রমিক বা প্রশিক্ষিত নারী কেয়ারগিভার দরকার হয়, নিয়োগকর্তারা আমাদের ডাটাবেজে খুঁজে সঙ্গে সঙ্গেই যোগ্য কর্মী খুঁজে পাবেন।

তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে সরকার ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করছে। ওই অঞ্চলে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে শ্রম চুক্তি করেছে। অন্যদের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।

নুর বলেন, জনমিতিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের কারণে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ায় ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বাংলাদেশি কর্মীদের বড় গন্তব্য হবে। এখন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো দেশভিত্তিক শ্রম চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে সাজানো হচ্ছে।

জাপানের বিষয়ে নুর বলেন, দেশটিতে ১ লাখ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের চুক্তিটি এখনো কার্যকর রয়েছে, তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বড় পরিসরে নিয়োগ বাড়ানোর আগে জাপান বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের মান, শৃঙ্খলা ও কাজের সংস্কৃতি মূল্যায়ন করছে। আস্থা তৈরি হলেই নিয়োগের গতি বাড়বে।’

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আশা প্রকাশ করে নুর বলেন, স্বচ্ছ ও প্রায় শূন্য খরচের নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করতে দুই দেশ নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। এর লক্ষ্য কর্মী শোষণ ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় বন্ধ করা।

তিনি জানান, শিগগির মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। এরপর দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধনের কাজ করবে।

নুর বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী কমানো, ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং কর্মী শোষণ বন্ধে দুপক্ষই অঙ্গীকারবদ্ধ। এ উদ্যোগ বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক আলোচনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই আলোচনায় স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়েছিল।

শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সরকার বেশ কিছু কল্যাণমূলক উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং সুবিধা এবং কিউআর-কোড-ভিত্তিক যাচাইকরণ সুবিধা সম্বলিত একটি ডিজিটাল ‘প্রবাসী কার্ড’।

মন্ত্রণালয় বৈদেশিক কর্মসংস্থান সেবাও ডিজিটাল করছে। ফলে অভিবাসন ছাড়পত্র ও কাগজপত্র জমা দেওয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে।

প্রবাসীদের দেশে ফেরার পর বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সরকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল, একটি স্কিল ইনভেস্টমেন্ট পার্ক, আবাসন প্রকল্প এবং একটি ‘প্রবাসী সিটি’র করার কথাও বিবেচনা করছে।

নুর বলেন, প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি, আহত হয়ে ফেরা কর্মীদের আর্থিক সহায়তা এবং বিপদগ্রস্ত অভিবাসী, বিশেষ করে নারীদের পুনর্বাসন সহায়তা চালু থাকবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু বেশি কর্মী বিদেশে পাঠানো নয়, বরং তারা যেন নিরাপদে যেতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং পুরো অভিবাসন যাত্রায় সঠিক সহায়তা পায়, সেটা নিশ্চিত করা।’

সূত্র : বাসস

এই নিউজটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও খবর