রিজিক মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি। কেউ জীবিকার সংকটে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, কেউ উপার্জন করেও বরকতের অভাবে অস্থির, আবার কেউ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ভীত। অথচ একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, রিজিক কেবল পরিশ্রমের ফল নয়; বরং তা আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত দান। মানুষের চেষ্টা একটি কারণ মাত্র, কিন্তু রিজিকের ফয়সালা আসমানে হয়।
রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। (সুরা হুদ: ৬)
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, আসমানে রয়েছে তোমাদের রিজিক এবং যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছে। (সুরা আয-যারিয়াত : ২২)
নিচে পাঠকদের জন্য এমন কিছু আমল তুলে ধরা হলো যা রিজিকে বরকত আনে, দারিদ্র্য দূর করে এবং রহমতের দুয়ার খুলে দেয়।
১. তাকওয়া অবলম্বন করা
রিজিক বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। (সুরা আত-তালাক : ২-৩)
এই আয়াতে আল্লাহ দুটি সুসংবাদ দিয়েছেন, সংকট থেকে মুক্তির পথ এবং অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিজিক। তাই গোনাহ বর্জন, ফরজ আদায় এবং আল্লাহভীতির জীবনই রিজিকে বরকতের অন্যতম কারণ।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
গোনাহ মানুষের জীবনে বরকত কমিয়ে দেয়, আর ইস্তিগফার রহমত ও কল্যাণের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী সৃষ্টি করবেন। (সুরা নুহ: ১০-১২)
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার প্রতিটি সংকট থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন, সব দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। (আবু দাউদ: ১৫১৮)
৩. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া
সালাত শুধু ইবাদত নয়; বরং বরকতের অন্যতম উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমার পরিবারকে সালাতের আদেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে রিজিক চাই না; বরং আমিই তোমাকে রিজিক দিই। (সুরা ত্ব-হা: ১৩২)
এ আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, রিজিকের মালিক আল্লাহ। তাই রিজিকের চিন্তা যেন মানুষকে সালাত থেকে দূরে না সরিয়ে দেয়।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা রিজিক বৃদ্ধি ও জীবনে বরকতের অন্যতম কারণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ুতে বরকত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৫৭)
এ সম্পর্ক রক্ষা শুধু অর্থনৈতিক নয়, পারিবারিক শান্তি ও সামাজিক কল্যাণও বয়ে আনে।
৫. দান-সদকা করা
শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে দান থেকে বিরত রাখতে চায়। কিন্তু আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদের তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। (সুরা আল-বাকারা: ২৬৮)
আল্লাহ আরও বলেন, তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে আরও দান করেন। তিনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা (সুরা সাবা: ৩৯)। রাসুল (সা.) বলেছেন ,দান করার কারণে কোনো সম্পদ কমে না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)
আরেক হাদিসে এসেছে, প্রতিদিন দুইজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। একজন বলেন, হে আল্লাহ! দানকারীর সম্পদের বদলা দিন। অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণ ব্যক্তির সম্পদ ধ্বংস করে দিন। (সহিহ বোখারি: ১৪৪২)
৬. হালাল উপার্জন করা
হালাল উপার্জনে বরকত রয়েছে, আর হারাম উপার্জন ইবাদত কবুল হওয়ারও অন্তরায়। রাসুল (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, সে দীর্ঘ সফরে, এলোমেলো চুলে, ধূলিধূসর অবস্থায় দুই হাত তুলে দোয়া করে, হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা প্রতিপালিত। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম : ১০১৫)
অতএব, রিজিকে বরকত চাইলে হালাল উপার্জনের বিকল্প নেই।
৭. আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করা
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। রাসুল (সা.) বলেছেন,তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথার্থ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন; তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। ( তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)
৮. হজ ও ওমরাহ পালন করা
তোমরা হজ ও উমরাহ ধারাবাহিকভাবে আদায় করো। কেননা, এ দুটি (হজ ও উমরাহ) দারিদ্র্য ও গোনাহকে এমনভাবে দূর করে, যেমন হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে। আর কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয় ।(জামে তিরমিজি : ৮১০)
রিজিকের প্রকৃত প্রাচুর্য কেবল সম্পদের আধিক্যে নয়; বরং হালাল উপার্জনে বরকত, অন্তরের প্রশান্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিতেই প্রকৃত সমৃদ্ধি নিহিত। তাই সংকটের সময় কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত এসব আমল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেন না; তাঁর ওপর ভরসাকারী কখনো নিরাশ হয় না।
লেখক: শরিয়াহ কনসালট্যান্ট