দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভাঙাচোরা রাস্তা এবং জরাজীর্ণ পুল-কালভার্টের দুর্ভোগ পেছনে ফেলে উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনায় আলোকিত হচ্ছে নেছারাবাদ উপজেলার ১ নম্বর বলদিয়া ইউনিয়নের জনপদ। যেখানে একসময় সামান্য পথ চলাও ছিল চরম দুর্ভোগ ও মরণফাঁদের নাম, সেখানে আজ স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমেই গড়ে উঠছে উন্নয়নের এক অনন্য ইতিহাস।
৪৭তম মহান মে দিবস উপলক্ষে ‘সবার আগে বলদিয়া’ টিম আবারও মানবিকতা, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। গত শুক্রবার ও শনিবার তারা বিন্না ও সোনারঘোপ গ্রামের সংযোগ সড়কের ওপর ৩টি নতুন পুল নির্মাণ করে সোনারঘোপ, খেজুরবাড়ী, লেবুবাড়ী ও কাঠাপিটানিয়া এই চারটি সনাতনী হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সংকট দূর করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে এসব গ্রামের সঙ্গে বলদিয়া ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে চলাচল হয়ে উঠত আরও দুর্বিষহ। কোথাও বাঁশের সাঁকো, কোথাও ভাঙা কাঠের পুল ফলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক এবং সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হতে হতো। মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগত ৩০ মিনিটেরও বেশি।
জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাস্তবায়িত হয়নি, তখন এলাকাবাসী নিজেরাই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় “সবার আগে বলদিয়া” নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, গ্রাম্য চিকিৎসক, ব্যবসায়ী এবং একদল উদ্যমী তরুণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুরু হয় এই উন্নয়নের যাত্রা।
সংগঠনের সদস্যদের স্বেচ্ছাশ্রম এবং ক্ষুদ্র অর্থায়নে গত মাত্র আট মাসে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে ৬৮টি পুল এবং একাধিক মাটির সড়ক। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার নির্ধারিত পোশাকে হাতে খন্তা, কুড়াল ও হাতুড়ি নিয়ে মাঠে-ঘাটে নেমে পড়েন তারা। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক।
যেখানে একসময় মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হতে হতো, সেখানে এখন সহজেই মোটরসাইকেল, অটোরিকশা এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে। কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা ছাড়াই এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যেই উপজেলা ও জেলা জুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু পুল নির্মাণের গল্প নয় এটি গ্রামীণ ঐক্য, আত্মনির্ভরতা, সম্প্রীতি এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত চারটি গ্রামের মানুষের জন্য মে দিবসে এই উপহার যেন হয়ে উঠেছে নতুন জীবনের স্বস্তির সেতুবন্ধন।
বলদিয়ার মানুষ আজ প্রমাণ করে দিয়েছে ইচ্ছাশক্তি, সততা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে উন্নয়ন কখনও থেমে থাকে না; বরং স্বপ্নগুলো একদিন বাস্তবের পুল হয়ে মানুষের জীবন বদলে দেয়।
সংগঠনের সভাপতি মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, আগে আমাদের এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল। মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাতো। এখন আমরা নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সেই চিত্র বদলে দিচ্ছি। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সংগঠনের সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তিই আমাদের এই উদ্যোগের জন্ম দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। আমরা চাই, আমাদের এই উদ্যোগ অন্য এলাকাগুলোর জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক।
বলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান বলেন, সরকারি বরাদ্দ সীমিত থাকলেও গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, ‘সবার আগে বলদিয়া’ তার উজ্জ্বল প্রমাণ। এটি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।