ভোরের আলো ফোটার আগেই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন আয়নাল হক। দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্যাডেল ঘুরিয়েছেন। রাতে ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ফিরেছেন বাড়িতে। রিকশার আয়েই চলেছে সংসার, তবুও শত কষ্টের মাঝে পড়াশোনা করিয়েছেন দুই ছেলেকে। সামর্থ্য সীমিত হলেও সন্তানদের স্বপ্নের সীমা কখনো বেঁধে দেননি তিনি।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের সেই রিকশাচালক আয়নাল হকের বড় ছেলে মো. নাজমুল হাসান এখন পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুদূর সুইডেনে। ইউনিভার্সিটি অব স্কোভডেতে ‘মাস্টার্স ইন বায়োসায়েন্স’ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন শতভাগ টিউশন ফি মওকুফসহ পূর্ণ বৃত্তি। তবে বৃত্তি পাওয়ার পরও বিদেশযাত্রার খরচ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বড় বাধা। সে-ই সংকটের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নাজমুল। তার সংগ্রাম, পড়াশোনা ও সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি শুনে প্রধানমন্ত্রী তাকে আর্থিক অনুদান দেন। একইসঙ্গে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন।
নাজমুলের গল্পটা অবশ্য সুইডেনের বৃত্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। এর পেছনে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, বাবার ঘাম আর নিজের অদম্য পরিশ্রম। খামারকান্দি গ্রামের সাধারণ পরিবারে নাজমুলের বেড়ে ওঠা। বাবা আয়নাল হক রিকশাচালক, মা নারজিনা খাতুন গৃহিণী। সংসারে সচ্ছলতা ছিল না। প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগানোই ছিল বাবার বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অর্থকষ্ট সন্তানদের পড়াশোনার পথে বাধা হোক, এটি মানতে চাননি বাবা আয়নাল হক। রিকশা চালিয়ে যে আয় করেছেন, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার সামলেছেন, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
বাবার সেই সংগ্রাম নাজমুলও কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে নিজের পড়াশোনার খরচ মেটাতে তাকেও কাজ করতে হয়েছে। কখনো রাজমিস্ত্রির সহযোগী, কখনো হোটেল কিংবা দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন। দিনের বেলায় শ্রম দিয়েছেন, আর সুযোগ পেলেই বই হাতে নিয়েছেন। অনেক রাত কেটেছে পড়ার টেবিলে। দারিদ্র্য তাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতাই তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে একসময় জায়গা করে নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান (Biochemistry and Molecular Biology) বিভাগে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী বর্তমানে মাস্টার্সের থিসিস করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ থেকেই বিদেশে পড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নাজমুল। দীর্ঘ চেষ্টা শেষে সেই স্বপ্নের দুয়ার খুলে যায় সুইডেনে। ইউনিভার্সিটি অব স্কোভডেতে ‘মাস্টার্স ইন বায়োসায়েন্স’ পড়ার জন্য শতভাগ টিউশন ফি মওকুফসহ পূর্ণ বৃত্তি পান তিনি। জীবনের বড় অর্জন হলেও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন দুশ্চিন্তা।
বৃত্তির আওতায় টিউশন ফি ও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা থাকলেও বিমানভাড়া, আবাসন এবং শুরুতে জীবনযাপনের খরচ বহন করার মতো সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। রিকশা চালিয়ে যে আয় করেন আয়নাল হক, তা দিয়ে সংসার চালানো এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করাই কঠিন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও নাজমুলের সুইডেনযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একদিকে বহু বছরের পরিশ্রমে অর্জিত বৃত্তি, অন্যদিকে বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে থমকে যাওয়ার উপক্রম হয় তার স্বপ্ন।
এই পরিস্থিতিতে নাজমুলের উচ্চশিক্ষার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেরপুরের ডা. মনজুর রশিদের সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী চিকিৎসক ডা. এএনএম মনোয়ারুল কাদির বিটুর মাধ্যমে তার আবেদনপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায়। এরপর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নাজমুল। সেখানে নিজের শৈশব, পরিবারের আর্থিক সংকট, পড়াশোনার সংগ্রাম এবং সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
নাজমুলের কথা শুনে তার উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা এবং দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার পরামর্শ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুভূতি জানিয়ে নাজমুল বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারেক রহমান তার অনুপ্রেরণার একজন মানুষ। সরাসরি সাক্ষাৎ করে নিজের সংগ্রামের কথা বলা এবং তার কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া তার জীবনের স্মরণীয় একটি ঘটনা।
নাজমুল জানান, তার বাবা একজন রিকশাচালক। বাবার উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই তাদের পড়াশোনা এগিয়েছে। সুইডেনে শতভাগ বৃত্তি পাওয়ার পরও বিমানভাড়া ও সেখানে থাকা-খাওয়ার প্রাথমিক খরচ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় সেই অনিশ্চয়তা কেটে গেছে।
তিনি আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে তার কথা শুনেছেন এবং মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে দক্ষ বিশেষজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই সহযোগিতা তাকে আরও দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নাজমুলের বাবা আয়নাল হক বলেন, সন্তানদের পড়াশোনা করানোর জন্য তিনি সবসময় কষ্ট করেছেন। রিকশা চালিয়ে সংসার চালানো সহজ ছিল না, তবু ছেলেদের পড়াশোনা বন্ধ করেননি। বড় ছেলে এতদূর যেতে পারায় তার দীর্ঘদিনের কষ্ট সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ছেলে বিদেশে গিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করে দেশের জন্য কিছু করার প্রত্যাশাও রয়েছে তার।
নাজমুলের ছোট ভাই মো. আতিক হাসানও পড়াশোনা করছেন। এবার তিনি শেরপুর সরকারি কলেজে এইচএসসি শিক্ষার্থী। দুই ছেলেকে ঘিরেই আয়নাল হক ও নারজিনা খাতুনের স্বপ্ন।
নাজমুল তার এই পথচলায় পরিবারের পাশাপাশি যারা বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিশেষভাবে ডা. এএনএম মনোয়ারুল কাদির বিটু, ডা. মনজুর রশিদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আরিফ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সর্দার জহুরুলসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।
খামারকান্দির মেঠোপথ থেকে সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়, নাজমুলের এই যাত্রা কেবল একটি শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার গল্প নয়। এর ভেতরে আছে একজন রিকশাচালক বাবার ঘাম, একজন মায়ের ত্যাগ, সন্তানের অদম্য চেষ্টা এবং সংকটের সময়ে পাওয়া সহযোগিতার গল্প। যে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে আয়নাল হক বছরের পর বছর সংসারের চাকা সচল রেখেছেন, সেই রিকশার আয়ের একটি অংশেই গড়ে উঠেছে ছেলের ভবিষ্যৎ। আজ সেই ছেলে নতুন স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিতে যাচ্ছেন সুদূর সুইডেনে।
নাজমুলের সামনে এখন নতুন লড়াই, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং নিজেকে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা। তার পেছনে থাকবে খামারকান্দির সেই ছোট ঘর, রিকশার প্যাডেলে জমে থাকা বাবার ঘাম আর একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এই গল্প যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, অভাব মানুষের পথ কঠিন করে দিতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের পথ বন্ধ করে দিতে পারে না। শ্রম, মেধা, অধ্যবসায় আর একটু সহযোগিতা পেলে রিকশাচালকের ঘর থেকেও তৈরি হতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের স্বপ্নবাজ তরুণ।