রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০৯ অপরাহ্ন

এশিয়া কি ‘বিশ্বের প্রভু’ হতে পারবে

প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশের সময়ঃ শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩ বার পঠিত হয়েছে
এশিয়া কি ‘বিশ্বের প্রভু’ হতে পারবে

একসময় বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র ছিল ইউরোপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই কেন্দ্র সরে যায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, একবিংশ শতাব্দী কি এশিয়ার শতাব্দী?

প্রশ্নটি বাস্তবতার। কারণ, গত তিন দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য দৃশ্যমানভাবে এশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি এশিয়া। ২০২৬ সালের ভাষণে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে অবদান রাখছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে অঞ্চলটি সম্পৃক্ত।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানের অর্থনীতিগুলো এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সংযোগ। বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকেন্দ্র এখন এশিয়া। ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও এশীয় দেশগুলোর অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।

বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিন্সি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০১৯ সালের এক গবেষণায় বলেছিল, ২০৪০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপির অর্ধেকেরও বেশি এবং বিশ্ব ভোগব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত হতে পারে। গবেষণাটির মূল বক্তব্য ছিল, এশিয়া শুধু বিশ্বায়নের অংশগ্রহণকারী নয়, বরং বিশ্বায়নের পরবর্তী অধ্যায়ের অন্যতম নির্মাতা।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। অর্থনৈতিক শক্তি কি বিশ্ব নেতৃত্বের সমার্থক?

ইতিহাস বলছে, না। বিশ্ব নেতৃত্ব নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং এমন এক ধরনের নৈতিক বা আদর্শিক আকর্ষণের ওপর, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ‘সফট পাওয়া’ বলা হয়।

এখানেই এশিয়ার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, এশিয়া কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা নয়। চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ, দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা, তাইওয়ান প্রশ্ন, কোরীয় উপদ্বীপের সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দেখায় যে অর্থনৈতিক সংযোগ যত গভীরই হোক, রাজনৈতিক বিভাজন এখনও প্রকট।

দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে জন্মহার কমে যাওয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর তরুণ জনসংখ্যা বড় সম্ভাবনা হলেও সেই সম্ভাবনাকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপ দিতে শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। আইএমএফ ও এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং শ্রমবাজার সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।

তৃতীয়ত, ভূ-রাজনীতি। আজকের বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে। প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার রূপ নির্ধারণ করবে। ফলে এশিয়ার উত্থান ঘটলেও সেটি সংঘাতমুক্ত হবে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ‘বিশ্বের প্রভু’ ধারণাটি সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর ভাষা। বর্তমান বিশ্ব ক্রমশ বহুমেরু হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সামরিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অসাধারণ শক্তিশালী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ। ভারত দ্রুত উত্থানশীল। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও বিনিয়োগ রাজনীতিও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক ও চিন্তাবিদ কিশোর মাহবুবানি বহু বছর ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, পশ্চিমের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষ হচ্ছে এবং এশিয়ার প্রভাব বাড়বে। তবে তিনিও কোথাও বলেননি যে এশিয়া একাই পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করবে। বরং তিনি ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের কথাই বলেছেন।

আসলে ভবিষ্যতের বিশ্ব সম্ভবত হবে প্রতিযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এক জটিল সমীকরণ। সেখানে এশিয়া হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান মঞ্চ। কিন্তু সেটি একক আধিপত্যের বিশ্ব হবে না।

তাই প্রশ্নের উত্তরও সেখানেই নিহিত। এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্রও হতে পারে। কিন্তু ‘বিশ্বের প্রভু’ হওয়ার চেয়ে আরও বাস্তবসম্মত ধারণা হলো, ভবিষ্যৎ বিশ্বে ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে, আর সেই ভাগে এশিয়ার অংশ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড় হবে।

তথ্যসূত্র:

International Monetary Fund (IMF), Regional Economic Outlook: Asia and Pacific, April 2026IMF, Shaping Asia’s Future, Policy Address 2026McKinsey Global Institute, The Future of Asia: Asian Flows and Networks Are Defining the Next Phase of Globalization (2019)IMF Working Paper, Dissecting Medium-Term Growth Prospects for Asia (2025)OECD & Asian Development Bank, The Future of Asia in the World Economy

এই নিউজটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও খবর