আজ আবার বিশ্বকাপ মঞ্চে নামছে পর্তুগাল। রাত ১১টায় ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের মিশন। তবে পর্তুগাল যখন মাঠে নামবে, তখন শুধুই এটি একটি ফুটবল ম্যাচে সীমাবদ্ধ থাকবেনা। শুরু হবে হয়তো এক কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বয়স এখন ৪১। সাধারণত এই বয়সে ফুটবলাররা অতীতের গল্প বলেন। কেউ কোচিংয়ে যান, কেউ টেলিভিশনের আলোচক হয়ে বসেন। কিন্তু রোনালদো এখনো মাঠে। এখনো গোলের খোঁজে ছুটছেন। এখনো স্বপ্ন দেখছেন।
আর সেই স্বপ্নের নাম বিশ্বকাপ। ফুটবল তাকে প্রায় সবকিছু দিয়েছে। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, নেশনস লিগ, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফিটা এখনো তার হাতে ওঠেনি।
এই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপটা অন্যরকম। এটা শুধু পর্তুগালের জন্য আরেকটি বড় টুর্নামেন্ট নয়। এটা রোনালদোর সঙ্গে একটি দেশের শেষ বড় স্বপ্ন দেখার গল্প।
পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে অনেক মহান নাম এসেছে। ইউসেবিও ছিলেন। লুইস ফিগো ছিলেন। রুই কোস্তা ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেননি।
রোনালদোও এখন পর্যন্ত পারেননি। ২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে সেমিফাইনালে উঠেছিলেন। এরপর আরও চারটি বিশ্বকাপ গেছে। কখনো স্পেন, কখনো জার্মানি, কখনো উরুগুয়ে, কখনো মরক্কো তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছে।
২০২২ সালে মরক্কোর কাছে হারের পর টানেল দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটা এখনো অনেকের চোখে ভাসে। সেদিন অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই বুঝি শেষ। কিন্তু রোনালদো হার মানেননি। চার বছর পর আবার তিনি বিশ্বকাপে। হয়তো শেষবারের মতো। তবে এবারের পর্তুগাল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।
রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে দলটি শুধু রোনালদো নির্ভর নয়। বরং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী মিডফিল্ড নিয়ে এসেছে তারা। ব্রুনো ফার্নান্দেজ আছেন সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ভিতিনিয়া এবং হোয়াও নেভেস মাঝমাঠে ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। বের্নার্দো সিলভা মাঠের প্রায় প্রতিটি অংশে প্রভাব ফেলতে পারেন।
রক্ষণভাগেও আছে দৃঢ়তা। রুবেন দিয়াস নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নুনো মেন্ডেস বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক। গোলবারের নিচে আছেন দিওগো কস্তা। আর সামনে আছেন রোনালদো।
তার কাজ এখন আগের মতো দৌড়ে পুরো মাঠ কাঁপানো নয়। তার কাজ গোল করা। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকা। অভিজ্ঞতা দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া।
তবে সবকিছু এত সহজও নয়। এই দলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রোনালদোকে ঘিরেই। আধুনিক ফুটবলে উচ্চগতির প্রেসিং এবং নিরন্তর দৌড়ের প্রয়োজন হয়। ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই সেটা করা কঠিন।
তাই তাকে ঘিরে পুরো দলকে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। উইংয়ের রাফায়েল লেয়াও, ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও কিংবা পেদ্রো নেতোকে রক্ষণেও অবদান রাখতে হবে।
মার্তিনেজের জন্য এটাও একটা বড় পরীক্ষা। তবে এই বিশ্বকাপে পর্তুগালের আবেগের জায়গাটা শুধু রোনালদো নন। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ডিওগো জোতা। জাতীয় দলের প্রাণবন্ত এই ফরোয়ার্ডের মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিশ্বকাপ দল ঘোষণার সময় কোচ মার্তিনেজ বলেছিলেন, এটি ২৬ জনের নয়, ২৭ জনের দল। কারণ ডিওগো জোতা এখনো তাদের সঙ্গে আছেন। হয়তো এই কথাটাই পর্তুগালকে আরও শক্ত করে বেঁধেছে।
আজ রাতে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর মাঠে নামবে তারা। কাগজে-কলমে প্রতিপক্ষ সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপে সহজ বলে কিছু নেই।
তার চেয়েও বড় কথা, আজকের ম্যাচে কোটি মানুষের চোখ থাকবে একজন মানুষের দিকে। তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। যে ছেলেটি মাদেইরার ছোট্ট দ্বীপ থেকে উঠে এসে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নামগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
যে মানুষটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে পর্তুগালের স্বপ্ন বহন করে চলেছেন। আজ রাতে হয়তো তিনি আরেকবার মাঠে নামবেন সেই পুরোনো ক্ষুধা নিয়ে। হয়তো এটাই তার ফুটবল জীবনের শেষ যাত্রার শুরু। হয়তো এটাই শেষ সুযোগ।
আর যদি ভাগ্য এবার তার দিকে একটু হাসে, তাহলে উত্তর আমেরিকার মাটিতে লেখা হতে পারে পর্তুগিজ ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি। পারবেন কী রোনাদো? পারবে কী পর্তুগাল? হয়তো সময়ই তার উত্তর দিয়ে দেবে।