যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সাধারণত প্রাণহানি এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদ দিয়েই মাপা হয়। কিন্তু যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ পরিণতি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়, আর তা হলো দূষণ। যুদ্ধজনিত দূষণ শহরের ওপর দীর্ঘদিন ভর করে থাকতে পারে, পানি ও মাটি দূষিত করতে পারে এবং সংঘাত শেষ হওয়ার বহু বছর পরও জনস্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ।
শনিবার (২৩ মে ) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করেছেন ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের জীবাশ্ম জ্বালানি উন্নয়ন, খনি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ফেলিক্স হর্ন।
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ছয় সপ্তাহব্যাপী বোমাবর্ষণ, বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা, ইতোমধ্যে বড় ধরনের পরিবেশগত ক্ষতি ডেকে এনেছে। জ্বলতে থাকা জ্বালানি ট্যাংক থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত কণা। অন্যদিকে ধ্বংসাবশেষ, বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যাওয়া বর্জ্য এবং তেলের অবশিষ্টাংশ উপসাগরের উপকূলীয় জলরাশি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এ ধরনের দূষণ হামলার স্থান ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ অঞ্চলের মানুষ অতীতেও দেখেছে, যুদ্ধজনিত পরিবেশগত ক্ষতি কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে পিছু হটার সময় ইরাকি বাহিনী কুয়েতের ৬০০টিরও বেশি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েক মাস ধরে ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল আকাশ। এর ফলে ভয়াবহ বায়ুদূষণ, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
পরবর্তীতে জাতিসংঘ এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতিকে ক্ষতিপূরণযোগ্য পরিবেশগত ক্ষতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘ ক্ষতিপূরণ কমিশনের মাধ্যমে ইরাককে সামুদ্রিক দূষণ ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মতো ক্ষতির জন্য ৫ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
ইউক্রেনও যুদ্ধের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আরেকটি ভয়াবহ উদাহরণ। চলমান যুদ্ধে জ্বালানি ডিপো, শিল্পকারখানা, রাসায়নিক গুদাম ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলার ফলে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাতাস, নদী ও কৃষিজমি দূষিত হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং ইউক্রেনীয় সংগঠনগুলো রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে হাজারো পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ড, বন উজাড়, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা থেকে দূষণ এবং পানি সরবরাহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা।
যুদ্ধের সময় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে। কারণ এসব স্থাপনায় বিপুল পরিমাণ দাহ্য জ্বালানি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকে। তেলের ডিপো, শোধনাগার বা পাইপলাইনে হামলা হলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা থেকে নির্গত হয় ক্যানসার সৃষ্টিকারী কণা এবং নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ। এসব উপাদান বছরের পর বছর আশপাশের জমি ও পানিকে দূষিত করে রাখে।
সংঘাত পরিবেশগত তদারকিও দুর্বল করে দেয়। যখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে, তখন পরিবেশগত আইন প্রয়োগ এবং করপোরেট জবাবদিহিতাও প্রায় অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর স্থাপনার আশপাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বোঝা বহন করতে বাধ্য হয়, যদিও তখন যুদ্ধের খবর আর শিরোনামে থাকে না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইয়েমেন ও সুদানের মতো অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির দেশে তেল পাইপলাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে কৃষিজমি ও পানির উৎস দূষিত হচ্ছে। ইয়েমেনে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ‘এফএসও সাফার’ নামের তেলবাহী জাহাজ বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণহীন অবস্থায় ছিল। এতে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ তেল দূষণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে জরুরি ভিত্তিতে তেল স্থানান্তর কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর সেই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।
যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতি জলবায়ু সংকটকেও আরও তীব্র করে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী, যার বড় অংশ এসেছে উচ্চ-নিঃসরণকারী জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে। তবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু হিসাব ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর নির্গমন এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের ছাড়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে। বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে এর অঘোষিত কার্বন পদচিহ্নও।
সংঘাত শুধু জ্বালানি খাতেই ক্ষতি করে না, আরও বিস্তৃত পরিবেশগত সংকট তৈরি করে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ভেঙে পড়লে এবং জ্বালানির সংকট দেখা দিলে মানুষ রান্না ও অন্যান্য কাজে কাঠ ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বন উজাড় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিকল্প জ্বালানির অভাব দেখা দেয়, সেখানে বন ধ্বংসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর সুদানের রাজধানী খার্তুমসহ বিভিন্ন শহরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য হারে গাছপালা ও বনভূমি কমে গেছে। অথচ এসব গাছপালা ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ভূমিকা পালন করে।
যুদ্ধ জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরেও নানা ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বোমাবর্ষণে ভবন, সড়ক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে ধুলিকণায় পরিণত হয়। এসব ধুলার সঙ্গে মিশে থাকে সিলিকা ও ভারী ধাতুসহ অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান, যা বাতাসে ছড়িয়ে মানুষের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত রোগকে আরও জটিল করে তোলে।
অন্যদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর পুনর্গঠনও জলবায়ুর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে। কারণ সিমেন্ট ও ইস্পাত উৎপাদন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পপ্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে পুনর্নির্মাণ কার্যক্রম নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আবারও বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ ঘটায়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামোও যুদ্ধের ক্ষতির শিকার হতে পারে। তবে এর পরিবেশগত প্রভাব মৌলিকভাবে ভিন্ন। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নদীতে অপরিশোধিত তেল ছড়িয়ে দেয় না, আর ক্ষতিগ্রস্ত বায়ুকল কোনো শোধনাগারের মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে আশপাশের এলাকায় বিষাক্ত বেনজিন ছড়ায় না।
যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যদি পুনর্নির্মিত জ্বালানি ব্যবস্থা আবারও তেল মজুত, গ্যাস পরিবহন ও কেন্দ্রীয় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতেও দূষণ এবং বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিতে থাকবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটে সংঘাত দেখা দিলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়বে।
অন্যদিকে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর গ্রিড যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে না পারলেও যুদ্ধ-পরবর্তী বিষাক্ত দূষণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা অনেকটাই কমাতে পারে।
যুদ্ধ অবকাঠামো ধ্বংস করবেই। তবে সেই যুদ্ধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কয়েক দশকের পরিবেশগত বিপর্যয় রেখে যাবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে যুদ্ধ শেষে কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হচ্ছে তার ওপর।