ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা হোসেইনি খামেনিকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা রবিবার মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর কয়েকদিন আগে থেকেই পশ্চিমা ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে আভাস দেওয়া হচ্ছিল, ৫৬ বছর বয়সী মোজতবাই খামেনির উত্তরসূরি হতে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) মোজতবার প্রতি তাদের ‘আন্তরিক ও আজীবন আনুগত্য’ ঘোষণা করেছে।
তারা তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে নিশ্চিত করেছেন, ‘তারা সব আদেশ মেনে চলবে এবং তা বাস্তবায়নে সদা প্রস্তুত থাকবে।’
দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য উত্তরসূরি
দীর্ঘদিন ধরেই মোজতবা খামেনিকে তার বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। খামেনি-ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তাকে সে ভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, বড় মাপের ধর্মীয় আলেম না হওয়া সত্ত্বেও তার ক্ষমতায় আরোহনের পেছনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসি।
১৯৬৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া মোজতবা ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার শৈশবেই তার বাবা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। পরে ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব–এর মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটলে খামেনি পরিবার ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে।
তেহরানে এসে মোজতবা পড়াশোনা করেন আলাভি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা নিতে কোম শহরে যান এবং রক্ষণশীল আলেমদের অধীনে দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন করেন।
তবে বহু বছর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পরও তিনি আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা অর্জন করতে পারেননি, যা সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংযোগ
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘হাবিব ব্যাটেলিয়ন’ নামের একটি ইউনিটে যুদ্ধ করেন মোজতবা খামেনি। সেই সময়েই ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ভবিষ্যৎ অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
সরকারি কোনো পদে না থাকলেও দীর্ঘদিন তাকে বাবার কার্যালয়ের অঘোষিত অভিভাবক হিসেবে দেখা হতো। একই ধরনের ভূমিকা পালন করেছিলেন ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির ছেলে আহমাদ খোমেনিও।
নিষেধাজ্ঞা ও বিতর্ক
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোজতবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, তিনি জবাবদিহিতার বাইরে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করছেন এবং তার বাবা কিছু দায়িত্ব ছেলের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন।
এ ছাড়া ইরানের সংস্কারপন্থি রাজনীতিক এবং কয়েকটি বিদেশি সরকার তার বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ বারবারই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে মোজতবাকে এখন একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। একদিকে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কৌশল ও প্রতিক্রিয়া সামলানো, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করাও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সবচেয়ে বড় কাজ হবে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা, কারণ দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাই দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও।