শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ১২:০৭ পূর্বাহ্ন

ইতালিতে সন্ত্রাসী হামলা রুখে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন বাংলাদেশি তরুণ

প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশের সময়ঃ শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
  • ২৪ বার পঠিত হয়েছে
ছবি : সংগৃহীত

ইতালিতে সন্ত্রাসী হামলা রুখে দিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন ২১ বছর বয়সী তরুণ সাকু তালুকদার। ইতোমধ্যে দেশটির সংবাদমাধ্যমে তাকে ‘বাঙালি হিরো’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট ও মোডেনা শহরের সেই রক্তাক্ত বিকেল : ইতালির মোডেনা (Modena) শহরের প্রাণকেন্দ্র ভিয়া এমিলিয়া (Via Emilia) সড়কে শনিবার (১৬ মে) বিকেলে এক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ইতালির স্বনামধন্য জাতীয় পত্রিকা ‘ইল রেস্তো দেল কার্লিনো’র (Il Resto del Carlino) ভেরিফাইড রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩১ বছর বয়সী সেলিম এল কুদ্রি (Salim El Koudri) নামের এক উগ্রপন্থি চালক তার গাড়ি নিয়ে ফুটপাতে উঠে পড়ে এবং একের পর এক পথচারীকে পিষে দেয়। এই নৃশংস হামলায় ঘটনাস্থলেই চারজন গুরুতর আহত হন, যার মধ্যে এক ইতালীয় নারীর পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

গাড়ি ভাঙচুরের পর ওই ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে হাতে একটি ধারাল ছুরি নিয়ে বাকিদের ওপর নতুন করে হামলা করতে ও পালাতে উদ্যত হয়, ঠিক তখনই সেখানে তৈরি হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি।

ইতালীয় নাগরিকেরা যখন ভয়ে দিকবিদিক পালাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে হাজির হন মোডেনায় বসবাসরত ২১ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ সাকু তালুকদার।

যেভাবে নিজের জীবন বাজি রেখে খুনিকে ধাওয়া করেন সাকু : ইতালির পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বিবরণী অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি যখন ছুরি উঁচিয়ে পালাচ্ছিলেন, তখন লুকা সিগনরেলি (Luca Signorelli) নামের এক ইতালীয় যুবক তার পিছু নেন। তাকে একা বিপদে পড়তে দেখে নিজের জীবনের পরোয়া না করে স্পট থেকে পালিয়ে না গিয়ে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েন সাকু তালুকদার।

এ বিষয়ে সাকু তালুকদার বলেন, ‘লুকা যখন খুনিকে জাপটে ধরেছিল, তখন ওই উন্মত্ত লোকটা লুকার বুকে আর মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। আমি এক সেকেন্ডও ভাবিনি যে, আমার নিজের জীবন চলে যেতে পারে। আমি সরাসরি গিয়ে ওই লোকের হাত থেকে ধারাল ছুরিটি কেড়ে নিই এবং রাস্তায় ছুড়ে ফেলি। পরে পুলিশ এলে আমিই রক্তাক্ত অস্ত্রটি উদ্ধার করে তাদের হাতে তুলে দিই।’

এখানেই শেষ নয়, খুনিকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার পর সাকু আবার ভিয়া এমিলিয়া সড়কে ফিরে যান। সেখানে ছটফট করতে থাকা আহত ইতালীয় নাগরিকদের জন্য পানি নিয়ে আসেন এবং পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স না আসা পর্যন্ত তাদের প্রাথমিক সেবা দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন।

ইতালীয় সংবাদমাধ্যমে সাকুকে নিয়ে সংবাদ : এই ঘটনার পর থেকে পুরো ইতালির মূলধারার গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সাকু তালুকদারের ছবি ও তার বীরত্বের কাহিনি ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করা হয়। ইতালীয়রা সাধারণত প্রবাসীদের নিয়ে যে ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, সাকুর এই নিঃস্বার্থ সাহসিকতা তা এক ধাক্কায় গুঁড়িয়ে দেয়।

গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাকু বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, সব বিদেশি বা অভিবাসীরাই খারাপ। তারা অপরাধ করতে আসে। কিন্তু এটা সত্যি নয়। আমরা সবাই এক নই। আমি ইতালপিৎজা (Italpizza) ফ্যাক্টরিতে সততার সঙ্গে কাজ করি। আমার বাবা-মা আমাকে শিখিয়েছেন, মানুষ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করতে হয়। ইতালির মানুষ যদি আজ আমাদের ভালো মানুষ হিসেবে চেনে, তবেই আমার সার্থকতা।’

জানা গেছে, ৪ বছর আগে লিবিয়া থেকে কাঠের নৌকায় চড়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে সিসিলির ল্যাম্পেডুসা (Lampedusa) দ্বীপে এসেছিলেন সাকু। যে সমুদ্রের বুক থেকে তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন, আজ ইতালির বুকেই সেই ইতালীয়দের জীবন বাঁচিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, বাঙালিরা কোথাও অপরাধ করতে যায় না, বরং বুক ভরা মানবতা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে যায়।

বর্তমান আইনি ও সামাজিক পরিস্থিতি : মোডেনা শহরের মেয়র এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সাকু তালুকদার ও তার সঙ্গে থাকা যুবকদের আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। উগ্রপন্থি হামলাকারী সেলিম এল কুদ্রি বর্তমানে ইতালির কড়া হেফাজতে জেলে রয়েছে। সাকুর বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে ছেলের এই বীরত্বের কথা শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তারা তাদের সন্তানের জন্য আজ গর্বিত।

 

এই নিউজটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও খবর