পবিত্র কোরআন কেবল একটি ধর্মীয় বিধিবিধানের গ্রন্থ নয়; বরং এটি এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। এই মহাগ্রন্থে প্রায় ৭৫০টি আয়াত রয়েছে, যা সরাসরি প্রাকৃতিক বিভিন্ন রহস্য নিয়ে আলোচনা করে এবং মানুষকে জ্ঞান অন্বেষণে নিরন্তর উদ্বুদ্ধ করে। আধুনিক বিজ্ঞান আজ থেকে মাত্র কয়েক দশক আগে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় যেসব রহস্য উন্মোচন করেছে, চৌদ্দশ বছর আগে মরুভূমির তপ্ত বালুকাধামে অবতীর্ণ এক ঐশী গ্রন্থে সেই সত্যগুলোর সুনিপুণ বর্ণনা আজ বিশ্ববাসীকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিচ্ছে।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত এমনই ১৩টি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জীবনের মূল উপাদান পানি: সুরা আল-আম্বিয়ায় আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। তারা কি তবুও বিশ্বাস করবে না?’ ( আয়াত: ৩০)। আধুনিক মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, প্রতিটি জীবন্ত কোষের প্রধান উপাদান হলো পানি। মরুভূমির তপ্ত বালুর মধ্যে বসে কোনো মানুষের পক্ষে এমন ধারণা করা সে যুগে অসম্ভব ছিল।
৪. ভ্রূণতত্ত্ব বা মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব: সুরা আল-মুমিনুন (১২-১৪)
পবিত্র কোরআনে মানুষের সৃষ্টির পর্যায়গুলো (কাদা মাটি, বীর্যবিন্দু, আলাকাহ এবং মুদগাহ) খুব নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমব্রায়োলজিস্ট প্রফেসর কিথ এল. মুর বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া কয়েক শতাব্দী আগে এই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
৫. আকাশের সুরক্ষা দেয় বায়ুমণ্ডল: কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আকাশকে একটি সুরক্ষিত ছাদ করেছি, কিন্তু তারা এর নিদর্শনসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়’। (সুরা আম্বিয়া : ৩২)
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, বায়ুমণ্ডল সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। এই সুরক্ষা স্তর না থাকলে মহাশূন্যের প্রচণ্ড শীতলতায় (মাইনাস ২৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পৃথিবীতে জীবন বিলুপ্ত হয়ে যেত।
৬. লোহার অলৌকিক উৎপত্তি: সুরা আল-হাদিদে আল্লাহ বলেন, ‘আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য প্রভূত কল্যাণ’ (আয়াত: ২৫)। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, লোহা পৃথিবীর নিজস্ব উপাদান নয়। কোটি কোটি বছর আগে উল্কাপাতের মাধ্যমে লোহা মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
৭. দুই সমুদ্রের মিলন ও অদৃশ্য দেয়াল: সুরা আর-রাহমানে উল্লেখ আছে, ‘তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন যারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়। তাদের মাঝে রয়েছে এক অন্তরায় (বাধা), যা তারা অতিক্রম করতে পারে না’। (আয়াত: ১৯-২০)
আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, ভিন্ন ভিন্ন লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের কারণে দুই সমুদ্রের পানি একত্রে মিললেও তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য বিভাজিকা থাকে।
৮. সূর্যের কক্ষপথ ও গতিশীলতা: এক সময় ধারণা করা হতো সূর্য স্থির। কিন্তু কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে’। (সুরা আম্বিয়া: ৩৩)
বিশ শতকের জ্যোতির্বিজ্ঞান এখন নিশ্চিত করছে যে, মহাজাগতিক প্রতিটি বস্তু প্রতিনিয়ত গতিশীল।
৯. পেরেক বা খোঁটার মতো পাহাড়: সুরা আন-নাবায় আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি পৃথিবীকে বিছানা এবং পাহাড়গুলোকে পেরেক (বা খোঁটা) স্বরূপ করিনি?’ (আয়াত: ৬-৭)। ভূ-তাত্ত্বিক ফ্রাঙ্ক প্রেস তার ‘আর্থ’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন যে, পাহাড়ের মূল অংশ মাটির গভীরে প্রোথিত থাকে, যা অনেকটা পেরেকের মতো পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে।
১০. মহাবিশ্বের প্রসারণ: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। স্টিফেন হকিং তার ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ গ্রন্থে একে এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার বলেছেন। অথচ কোরআনে আল্লাহ বহু আগে বলেছেন, ‘আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার শক্তি দ্বারা এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী’। (সুরা আজ জারিয়াত: ৪৭)
১১. ত্বকের ব্যথা অনুভবকারী কোষ: দীর্ঘকাল ধারণা ছিল ব্যথা কেবল মস্তিষ্কের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সুরা আন-নিসায় বলা হয়েছে, ‘জাহান্নামিদের চামড়া যখন পুড়ে যাবে, তখন আল্লাহ নতুন চামড়া দেবেন যাতে তারা আজাব ভোগ করতে পারে’ (আয়াত: ৫৬)। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, ত্বকে বিশেষ ‘পেইন রিসেপ্টর’ থাকে যা ছাড়া ব্যথার অনুভূতি পাওয়া সম্ভব নয়।
১২. সমুদ্রের গভীরের তরঙ্গ: সুরা আন-নুরে (আয়াত: ৪০) গভীর সমুদ্রের অন্ধকারের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, ‘সেখানে ঢেউয়ের ওপর ঢেউ থাকে’। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা আগে মনে করতেন ঢেউ শুধু উপরিভাগেই থাকে। কিন্তু এখন জানা গেছে যে, সমুদ্রের অভ্যন্তরেও শক্তিশালী তরঙ্গ বিদ্যমান, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
১৩. মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা ফ্রন্টাল লোব: সুরা আল-আলাকে আবু জেহেলের মিথ্যাচারের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘আমি তাকে তার কপালের চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে আনব—মিথ্যাবাদী, পাপিষ্ঠ কপালের ঝুঁটি’ (আয়াত: ১৫-১৬)। আধুনিক শারীরতত্ত্ব অনুসারে, মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা ‘প্রি-ফ্রন্টাল এরিয়া’ পরিকল্পনা, মোটিভেশন এবং মিথ্যা বলার জন্য দায়ী। কোরআন পাপিষ্ঠ মানুষের সেই অংশটিকেই নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করেছে।
পবিত্র কোরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়; বরং এটি হেদায়েতের কিতাব। তবুও এতে থাকা বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে, এই কিতাব কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং সর্বজ্ঞাতা মহান আল্লাহর বাণী। তাই তো সুরা আর-রাহমানে আল্লাহ বারবার প্রশ্ন করেছেন, ‘সুতরাং তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?’।
তথ্যসূত্র: দ্য মুসলিম ভাইব