বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে নাটকীয় হারের পর রেফারির একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে তুমুল বিতর্কে জড়িয়েছে জার্মানি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে ম্যাচের ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান তাহের করা একটি গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত। জার্মান শিবিরের দাবি, সেই গোল বহাল থাকলে ম্যাচের ভাগ্যই বদলে যেতে পারত।
ম্যাচের শুরুতেই হুলিও এনসিসোর গোলে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে কাই হাভার্টজ সমতা ফেরালে ১-১ ব্যবধানে শেষ হয় নির্ধারিত সময়। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। দুই দলই যখন একটি গোলের অপেক্ষায়, তখনই আসে ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শেষ দিকে কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে কোনো ডিফেন্ডারের বাধা ছাড়াই দারুণ এক হেডে বল জালে পাঠান জোনাথান তাহ। গোল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে মেতে ওঠে জার্মানির খেলোয়াড় ও সমর্থকরা। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে জার্মানি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই ভিএআর কক্ষ থেকে রেফারিকে গোলটি পুনরায় পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রিপ্লেতে দেখা যায়, কর্নার নেওয়ার ঠিক আগে জার্মান ডিফেন্ডার ভালডেমার আন্তনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মাটিতে পড়ে যান প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। যদিও তিনি পরে উঠে দাঁড়িয়ে বল ধরার চেষ্টা করেছিলেন, তবু ভিএআরের পর্যবেক্ষণে সেটিকে গোলরক্ষকের ওপর ফাউল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মরক্কোর রেফারি জালাল জায়েদ মাঠের পাশের মনিটরে রিপ্লে দেখার পর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ফলে জার্মানির সম্ভাব্য লিড আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
রেফারির এই সিদ্ধান্তের পরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে জার্মান শিবির। খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে প্রতিবাদ জানান। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে জার্মানির প্রধান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসম্যানও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি হলুদ কার্ডও দেখেন। ম্যাচ শেষে নাগেলসম্যান বলেন, তার মতে ঘটনাটি কোনোভাবেই ফাউল ছিল না। এমন একটি গোল বাতিল করাকে তিনি ‘রসিকতা’ বলেই অভিহিত করেন।
বিতর্কিত এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারারও। বিবিসিকে তিনি বলেন, ফুটবল শারীরিক সংস্পর্শের খেলা। এত সামান্য ধাক্কায় গোলরক্ষকের পড়ে যাওয়া এবং সেটিকে ফাউল হিসেবে বিবেচনা করা তার কাছে অত্যন্ত নরম সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে। শিয়ারারের দাবি, গোলরক্ষক নিজের আচরণ দিয়ে রেফারি ও ভিএআর কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রিমিয়ার লিগের সাবেক সহকারী রেফারি ড্যারেন ক্যানও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার মতে, চলতি বিশ্বকাপে ছোটখাটো সংস্পর্শের কারণেও কয়েকটি গোল বাতিল হতে দেখা গেছে। তবে এই ঘটনায় গোলরক্ষকের ওপর যে প্রভাব পড়েছিল, তা গোল বাতিলের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
গোলটি বহাল রাখা উচিত ছিল বলে মনে করেন ক্যান। তার মতে, ‘খুবই ছোটখাটো ফাউলের কারণে এর আগেও আমরা দুই থেকে তিনটি গোল বাতিল হতে দেখেছি। এটিও তেমন বড় কিছু ছিল না। গোলরক্ষককে সামান্য একটু ব্লক করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু গোল বাতিলের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। আমার অনুমান সত্যি হলো, ওরা গোলটা বাতিলই করল।’
স্কটল্যান্ডের সাবেক উইঙ্গার ও বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভের বিশ্লেষক প্যাট নেভিনও মনে করেন, ঘটনাটি ছিল ব্যাখ্যানির্ভর। তার ভাষায়, বক্সের ভেতরে কিছুটা ব্লক অবশ্যই হয়েছিল, কিন্তু সেটি গোলরক্ষককে কতটা বাধাগ্রস্ত করেছে, সেটি স্পষ্ট নয়। তাই গোল বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক।
নেভিন বলেন, ‘বক্সের ভেতর তখন হট্টগোল চলছিল। সেখানে একটা ব্লক অবশ্যই ছিল, কিন্তু সেটা কি গোলরক্ষককে বাধাগ্রস্ত করেছে? দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। তবে এটি সম্পূর্ণ রেফারির ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয়। সিদ্ধান্তটি মোটেও পরিষ্কার নয়।’
বিশ্বকাপ চলাকালে জার্মান টেলিভিশনে বিশ্লেষকের দায়িত্ব পালন করা লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনাল পুরো মৌসুমজুড়ে কর্নার ও সেট-পিস থেকে একই ধরনের পরিস্থিতিতে অসংখ্য গোল করেছে। যদি এই গোলকে অবৈধ ধরা হয়, তাহলে আর্সেনালের অনেক গোলও বাতিল হওয়া উচিত ছিল। তার মতে, বল জালে জড়ানোর মুহূর্তেই জার্মানি কার্যত ম্যাচটি জিতে গিয়েছিল, তাই এমন সিদ্ধান্ত অত্যন্ত নির্মম।
শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়েও আর কোনো গোল হয়নি। টাইব্রেকারে জার্মানির হয়ে কাই হাভার্টজ, নিক ভোল্টেমাডে ও জোনাথান তাহ পেনাল্টি মিস করলে ৪-৩ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় প্যারাগুয়ে। এই জয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে, আর বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তকে ঘিরে হতাশা নিয়েই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় জার্মানিকে।