ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে হঠাৎই নতুন করে মেরূকরণ শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’ চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে এসে যুক্ত না থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভোটের সমীকরণ গেছে অনেকটাই বদলে। অর্থাৎ এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে যে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ বা ‘এক বাক্স নীতি’ কার্যকরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। শুধু তাই নয়, এই নির্বাচনী ঐক্যে থাকা বাকি দশটি দলকে এখন নতুনভাবে ছক কষতে হচ্ছে। দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির পরও জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্যে শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বরং ২৬৮টি আসনে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে তারা রাজনীতির ময়দানে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে যে, ইসলামপন্থিদের ঐক্যে চিড় ধরল কেন? যদিও ইসলামী আন্দোলনের এই সিদ্ধান্ত রাজনীতির মাঠে কাকে লাভবান করবে, তা নির্ভর করছে নির্বাচনের প্রচার ও জনমতের ওপর। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটা স্পষ্ট যে ইসলামপন্থিদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ঐক্যের যে ‘সোনালি সুযোগ’ এসেছিল, তা আপাতত হাতছাড়া হয়ে গেল। ইসলামী আন্দোলন জোটে না থাকায় সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে বিএনপি। যদিও ‘১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’ থাকা দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, চরমোনাই পীরের দল তাদের জোটে না থাকা ভোটের সমীকরণে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। আর রাজনীতিতে শেষ বলে কথা নেই।
জাহাঙ্গীনরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, “ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১১ দলীয় জোটে না থাকার সিদ্ধান্তটি দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং রাজনীতিতে একটি নতুন মেরূকরণের ইঙ্গিত। দলটির এমন সিদ্ধান্ত মূলত আদর্শিক এবং কৌশলগত—উভয় দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা যায়। তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি বাংলাদেশের ‘ইসলামিক পলিটিক্যাল ব্লক’ বা ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের ঐক্যে একটি বড় ফাটল হিসেবেই দৃশ্যমান।”
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের নেতারা মনে করছেন যে, তারা এখন আর কোনো ছোট দল নয়। বিগত কয়েকটি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে তারা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছে, তাতে তারা নিজেদের একটি তৃতীয় শক্তি বা কিংমেকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। জামায়াতের অধীনে ১১ দলীয় জোটে যুক্ত হওয়া মানে হলো তাদের স্বকীয়তা ও প্রতীক (হাতপাখা) কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে যাওয়া। তারা হয়তো মনে করছে, ২৬৮ আসনে এককভাবে লড়লে তারা তাদের সাংগঠনিক শক্তির যে প্রদর্শনী করতে পারবে, তা জোটে থেকে সম্ভব হতো না।’
ভোটের মাঠে ইসলামপন্থিদের মধ্যে বিভাজনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী বিএনপি হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক শামছুল আলম। তিনি বলেন, ‘ধারণা করা হয় যে, দেশে ১৫-২০ শতাংশ ভোট সরাসরি ডানপন্থি বা ধর্মীয় দলগুলোর অনুকূলে থাকে। এখন যদি জামায়াত জোট এবং ইসলামী আন্দোলন আলাদাভাবে লড়ে, তবে এই ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে। এতে করে তাদের এককভাবে আসন জেতার সম্ভাবনা নাটকীয়ভাবে কমে গেল। এই বিভাজনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী বিএনপি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। পাশাপাশি তাৎক্ষণিক নির্বাচনী ফলাফলে এই অনৈক্য ইসলামপন্থি রাজনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে।’
কয়েকদিন ধরেই রাজনীতির মাঠে আলোচনার শীর্ষে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন এই নির্বাচনী ঐক্য। সর্বশেষ এই জোটে যুক্ত হয় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। গত সেপ্টেম্বর থেকে অভিন্ন কয়েকটি দাবিতে যুগপতভাবে আন্দোলন শুরু করে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ৮টি দল। জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলো হলো— ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস। সর্বশেষ এবি পার্টিসহ নতুন তিনটি দল সম্পৃক্ত হওয়ায় এই জোটে দলের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ১১টিতে। তবে গত শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে জোটে না থাকার কথা তুলে ধরে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন। ফলে এখন ১০টি দল রয়েছে এই নির্বাচনী ঐক্যে।
জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন না থাকলেও জামায়াত এখন ১০টি ছোট-বড় দলকে নিয়ে এগোচ্ছে (যাকে অনেকে ১১ দলীয় জোট বলছেন)। তবে জোটের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল চরমোনাই পীরের দলটি। তাদের অনুপস্থিতিতে জোটের ‘জনভিত্তি’ ও ‘মাঠ পর্যায়ের প্রভাব’ কতটা অটুট থাকে, তা এখন বড় প্রশ্ন। জোটের নেতারা যদিও বলছেন, তারা ২৫৩টি আসনে সমঝোতা করেছেন। তবে ইসলামী আন্দোলনের বিশাল কর্মী বাহিনী ও ভোট ব্যাংক জোটের বাইরে থাকাটা নির্বাচনী লড়াইয়ে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের’ কয়েকটি দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটে না থাকার পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ সামনে এসেছে। সেগুলো হচ্ছে—আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ এবং আদর্শিক সংঘাত। ইসলামী আন্দোলন শুরুতে ১০০-১২০টি আসনে নির্বাচনের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু সে বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় অন্তত ৫০টি আসন দাবি করেছিল। যদিও জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন ছাড় দিতে রাজি হয়নি। বাকি আসনগুলো ‘উন্মুক্ত’ রাখার বিষয়েও দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। অন্যদিকে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন প্রণয়ন করা হবে না বলে যে ঘোষণা দিয়েছে সেই আদর্শিক সংঘাতও সমঝোতায় না পৌঁছাতে পারার নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে। এ প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জামায়াত আমির ‘শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবেন না’ মর্মে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তাদের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা মনে করছেন, জামায়াত কৌশলী হয়ে আল্লাহর আইন থেকে সরে গেছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট একটি বাক্সে পড়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা হাতছাড়া হয়ে গেল। ইসলামী আন্দোলন আলাদাভাবে ২৬৮ আসনে প্রার্থী দেওয়ায় ইসলামপন্থি দলগুলোর সমর্থক ভোটারদের ভোট বিভক্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শক্তি যেমন কমবে, তেমনি এককভাবে বড় বিজয় ছিনিয়ে আনা দলগুলোর জন্য কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামী আন্দোলন জোটে না থাকায় এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে বিএনপি। কেননা, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ও ইসলামী আন্দোলন পৃথকভাবে নির্বাচন করলে ইসলামপন্থি ও ডানপন্থি ভোটগুলো ভাগ হয়ে যাবে। বহু আসনে এখন বিএনপি, জামায়াত জোট এবং ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে। এই বিভাজনের ফলে বিএনপি অনেক আসনে তুলনামূলক কম ভোটেও জয়ী হওয়ার সুযোগ পাবে। বিএনপি দল হিসেবে নিজেদের ‘উদার গণতান্ত্রিক’ শক্তির ধারায় পরিচিত করতে চাইছে। ইসলামপন্থিদের অনৈক্য তাদের এই অবস্থানকে আরও মজবুত করবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটে না আসায় ফাঁকা থাকা ৪৭টি আসন সমঝোতার আলোকেই বণ্টন হবে। সমঝোতা হওয়া আসনগুলোতে যে দলের প্রার্থী থাকবে, তিনি বাদে বাকিরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। ঐক্যবদ্ধভাবে সেটি প্রত্যাহার করা হবে। ফলে ১৯ জানুয়ারির আগে অন্য কোনো কিছুর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।’
মামুনুল হক বলেন, ‘এই মুহূর্তে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আর কোনো সুযোগ নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে।’
শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন তাদের জোটে না থাকার নেপথ্যে কোনো ষড়যন্ত্র কাজ করেছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্র আছে, এমনটা মনে হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে একসঙ্গে নির্বাচন করতে না পারাকে নিজেদের ব্যর্থতা বলেই ধরে নেওয়া যায়।’
ইসলামী আন্দোলন সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় তার প্রভাব নির্বাচনে পড়বে কি না—জানতে চাইলে খেলাফত মজলিস আমির বলেন, ‘সম্মিলিতভাবে ঐক্যের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই অঙ্গীকার থেকে সরে যায়নি দলগুলো। তাই খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।’
শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচনী সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলনের না থাকার বিষয়ে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব যুবায়ের। তিনি জানান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জোট বর্জনের সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করে শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবে জামায়াতে ইসলামী। এহসানুল মাহবুব যুবায়ের বলেন, ‘আমরা ১১ দল এখন ১০ দল। উনাদের (ইসলামী আন্দোলন) জন্য তো আমরা আসন ও চেয়ার রেখেছিলাম। আসনও আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম যে এতটা আসন আছে। এখনো সময় আছে।’
ইসলামী আন্দোলনের জন্য ফাঁকা রাখা ৪৭ আসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে ১০টি দল নির্বাচনী ঐক্য প্রক্রিয়ায় আছে তার একটা লিয়াজোঁ কমিটি আছে। সেই লিয়াজোঁ কমিটি এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত। আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তগুলো বা তাদের প্রস্তাবনাগুলো শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জানাবেন, তারপর সিদ্ধান্ত হবে।’