মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে একটি নতুন বিল অনুমোদন করেছেন। ‘স্যানকশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট অব ২০২৫’ নামের এই বিলটি এমন দেশগুলোর ওপর অন্তত ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে, যারা ‘জ্ঞাতসারে এই বাণিজ্যে জড়িত’।
মার্কিন সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম বলেন, দ্বিদলীয় সমর্থনের পথে থাকা এই বিলটির লক্ষ্য হলো ‘সস্তা রুশ তেল কেনা দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়া’, যা ভারতের জ্বালানি আমদানিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক আরো চাপের মুখে ফেলতে পারে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করেন যে রুশ সরকার বা রাশিয়ার নির্দেশে কাজ করা কেউ ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তবে ব্যাপক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হওয়া শান্তি চুক্তি লঙ্ঘিত হলে, ইউক্রেনে আরেকটি আগ্রাসন শুরু হলে অথবা ইউক্রেন সরকারকে উৎখাত, ভেঙে দেওয়া বা দুর্বল করার চেষ্টা হলে—এই ব্যবস্থাগুলোও পুনরায় কার্যকর হবে।
বিলে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে ‘রুশ উৎসের ইউরেনিয়াম ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিনিময়ে জ্ঞাতসারে জড়িত দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া সব পণ্য ও সেবার ওপর শুল্কহার অন্তত ৫০০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে—সেসব পণ্য ও সেবার মূল্যের তুলনায়’।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গ্রাহাম বলেন, ‘আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠকের পর, তিনি সেই দ্বিদলীয় রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিলটিতে সবুজ সংকেত দিয়েছেন, যেটি নিয়ে আমি সিনেটর ব্লুমেনথালসহ বহুজনের সঙ্গে মাসের পর মাস কাজ করেছি।’ বিলটির সময়োপযোগিতা ব্যাখ্যা করে তিনি আরো বলেন, ‘ইউক্রেন শান্তির জন্য ছাড় দিচ্ছে আর পুতিন কেবল কথার ফুলঝুরি দিচ্ছেন—নিরীহ মানুষ হত্যাই চলছেই।
’
তিনি বলেন, ‘এই বিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সস্তা রুশ তেল কিনে পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রে জ্বালানি জোগানো দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেবে। এটি চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বিপুল প্রভাব খাটানোর সুযোগ দেবে, যাতে তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অর্থ জোগানো সস্তা রুশ তেল কেনা বন্ধে প্রণোদিত হয়।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে গ্রাহাম বলেন, একই ইস্যুতে ২০২৫ সালের আগস্টে আরোপিত উচ্চ শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য ভারত ওয়াশিংটনের কাছে তদবির করছে। গ্রাহামের দাবি, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রা গত মাসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নয়াদিল্লির রুশ তেল কেনা কমানোর বিষয়টি তুলে ধরেন এবং অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কে ছাড় চান।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাস ধরেই একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ করছে, তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি; রুশ তেল ও দুগ্ধপণ্য এই আলোচনার প্রধান বিরোধের বিষয়। সর্বশেষ বাণিজ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১০–১২ ডিসেম্বর, যখন মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতে আসেন।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের সঙ্গে সাংবাদিকদের গ্রাহাম বলেন, ‘এক মাস আগে আমি ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বাড়িতে ছিলাম, আর তিনি শুধু এই কথাই বলছিলেন যে ভারত কম রুশ তেল কিনছে। তিনি আমাকে প্রেসিডেন্টকে ২৫ শতাংশ শুল্ক শিথিল করার কথা বলতে বলেন।’ আগস্টে এই শুল্ক আরোপ করা হয়; যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি ছিল, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি বাণিজ্য পরোক্ষভাবে ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সহায়তা করছে।
অতিরিক্ত শুল্ক যোগ হওয়ায় কিছু ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্ক ৫০ শতাংশে পৌঁছয়।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, এই শুল্কগুলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে। হাউস জিওপি মেম্বার রিট্রিটে তিনি বলেন, বাণিজ্য পদক্ষেপে মোদি অসন্তুষ্ট, তবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি আমার ওপর খুব খুশি নন, কারণ এখন তারা অনেক শুল্ক দিচ্ছে, কারণ তারা তেল কেনা বন্ধ করছে না—কিন্তু তারা এখন তা খুব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে, যেমনটা আপনি জানেন, রাশিয়া থেকে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার সতর্ক করেছেন, ‘রুশ তেলের ইস্যুতে সহযোগিতা’ না করলে ভারতের ওপর শুল্ক আরো বাড়তে পারে—এভাবে তিনি বাণিজ্য চাপকে সরাসরি রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার দাবি, ছাড়মূল্যের রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধযন্ত্রকে জ্বালানি জোগাচ্ছে।
তবে ভারত দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি রুশ তেল কেনা বন্ধের আশ্বাস দিয়েছেন—ট্রাম্পের এমন আগের দাবিকে নয়াদিল্লি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এমন কোনো কথোপকথন হয়নি। ওয়াশিংটন যখন নিষেধাজ্ঞা বিলটি এগিয়ে নেওয়ার পথে এগোচ্ছে, তখন প্রস্তাবিত আইনটি ভারতের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
একই সময়ে ট্রাম্প নিজেকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন, তবে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।