মানুষের চাপে উভয় পাশে যান চলাচল ব্যাহত হয়। হাসপাতালের সামনের রাস্তায় দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিএনপির চেয়ারপারসনের ছবি প্রদর্শন করছেন। কেউ কেউ ডুকরে কেঁদে উঠছেন। অনেকে আহাজারি করছিলেন।
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী জামিল খান বলেন, ‘রাজনীতির কঠিন সময়ে চলে গেলেন আমাদের অভিভাবক। এ ক্ষতি অপূরণীয়। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন।’
সকাল ১১টায় এভারকেয়ার হাসপাতালের উল্টো দিকের রাস্তার পাশে ১০ থেকে ১২ জন মাদরাসা শিক্ষার্থীকে কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যায়। জানা যায়, ওয়ারী থানা যুবদলের সাবেক নেতা সাইফুল হক এসব শিক্ষার্থীকে কোরআন খতমের জন্য নিয়ে এসেছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বেগম জিয়া পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর জন্য দোয়া ও কোরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে।’
হাসপাতাল থেকে ২০ গজ দূরে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের অনেক নেতাকর্মী। তাঁদের অনেকে খালেদা জিয়ার শোকে বিলাপ করে কাঁদছিলেন।
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মহিলা দলের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা বিলকিস বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের শেষ আশ্রয় ছিলেন বেগম জিয়া। তাঁর মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। তবু মেনে নিতে হচ্ছে। তিনি আমাদের মাতৃস্নেহে রেখেছিলেন। এ মুহূর্তে কিছু বলার ভাষা আমাদের নাই। আমরা উনার আত্মার শান্তি কামনা করছি।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হকের সমর্থক পরিচয় দেওয়া শেলী নামের এক কর্মীকে ডুকরে কাঁদতে দেখা যায়। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, ‘খালেদা জিয়া মরে গেলেও তিনি ছায়া হয়ে থাকবেন। আমরা কী করব—মাকে হারালাম। এখন তারেক রহমানের আমরা ছাড়া কেউ নাই। আমরা শুধু বলব, জনগণ যেন তারেক রহমানের পাশে থাকে, তাঁর ক্ষতি যেন কেউ না করতে পারে।’
এর মধ্যে হাসপাতালে এসেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মনজু।
ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর জুলুম হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, কিন্তু তিনি কোনো দিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। তিনি কোনো দিন আপস করেননি। তিনি রাজপথে যুদ্ধ করেছেন।’
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘বাংলাদেশে যখনই গণতন্ত্র, দেশপ্রেম ও নিখাদভাবে মানুষের জন্য কাজ করার প্রশ্ন আসবে, তখনই খালেদা জিয়াকে মানুষ স্মরণ করতে হবে। তিনি সব সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। কৃষক, শ্রমিক ও মেহেনতি মানুষের পাশে তিনিই সবচেয়ে বেশি থেকেছেন। তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজপথে লড়াই করেছেন।’
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা দেশে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অফিসপাড়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিভাগীয় সব নগর ও শহর-গ্রামে শোকের পরিবেশ বিরাজ করে।
রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুতে শোক পালন করা হচ্ছে। স্থানীয় দলীয় কার্যালয়গুলোতে নেতাকর্মীদের কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
বিএনপির উদ্যোগে সাত দিনের শোক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো ব্যাজ ধারণ, দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন। দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন বিএনপি, যুবদল, মহিলা দল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও অনুসারীরা।
খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামী রাজনৈতিক যাত্রা শুরু আশির দশকে। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতবরণের পর যখন দল ও দেশ এক চরম সংকটে, তখন তিনি বিএনপির রাজনীতিতে আসেন। তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের মানুষের কাছে গেছেন। ওই সময় বহুবার তাঁকে গৃহবন্দি করা হলেও কখনো ক্ষমতাসীনের সঙ্গে আপস করেননি। ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে তাঁর সেই অনড় অবস্থানের কাছেই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল স্বৈরাচার।