রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৪ পূর্বাহ্ন

ঢাকাস্থ ইরানের রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য ইরান প্রস্তুত

প্রতিবেদকের নাম
  • প্রকাশের সময়ঃ বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার পঠিত হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আলোচনার মাঝপথেই হামলা চালিয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকাস্থ ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি। তিনি বলেন, আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি, তবে তারা যদি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় আমরা আমেরিকা ও ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আছি। বুধবার (৪ মার্চ) গুলশানে ইরানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রদূত জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কোনো গোপন আশ্রয়কেন্দ্রে বা গোপন অবস্থায় ছিলেন না।

তিনি যুদ্ধের হুমকির মধ্যেও রোজা রাখা অবস্থায় তার কার্যালয়ে পরিবার ও জনগণের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি তার পরিবার ও জনগণের পাশে ছিলেন। তিনি চরম অবস্থার মধ্যেও জনগণের কাছ থেকে আলাদা হননি এবং সব সময় জনগণের পাশে ছিলেন। রাষ্ট্রদূত পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপ্রধান রেজা শাহর কথা উল্লেখ করে বলেন, এর আগে তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
তিনি জানান, ইরানে নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট এবং বিচার বিভাগের প্রধানরা রয়েছেন। এক্সপার্ট কাউন্সিল ইতিমধ্যে নতুন নেতা নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে।

ইরানের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি প্রকাশের জন্য ইরানের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক দল, জনগণ এবং গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত মিছিল ও সভার সব ছবি আমি ইরানে পাঠিয়েছি এবং তা দেখে ইরানের জনগণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছে যে বিপদের সময় বাংলাদেশের মানুষ তাদের পাশে আছে।আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিজের ইচ্ছাকে ছাপিয়ে দিতে ইরানের ওপর হামলা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক আইন এবং পারমাণবিক অস্ত্রের অপ্রসারণ সংক্রান্ত চুক্তি (এনপিটি) নিয়ম মেনেই পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ করেছি এবং এটি আমাদের অধিকার। আমরা পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করব এবং উন্নয়ন করব। ইসরায়েল যখন-তখন ফিলিস্তিনিদের ওপর গাজায় হামলা করতে পারবে, কিন্তু অন্যদের আত্মরক্ষার অধিকার থাকবে না এটি হতে পারে না।

তারা চায় না আমাদের প্রতিরক্ষা শক্তি বা কোনো স্বাধীনতা থাকুক। তারা আমাদের মিসাইল বানানোর কার্যক্রমও বন্ধ করাতে চায়। অনেকে তাদের কথা মেনে নিলেও তাদের আমেরিকা হত্যা করেছে। তারা চায় সব মুসলিম দেশ সব সময় আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল থাকুক। গাজা ও মিনার একটি স্কুলে আমেরিকান হামলায় ১৬০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হতাহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে পশ্চিমা গণমাধ্যমের নীরবতার সমালোচনা করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, বাহরাইন, সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো অনেক দেশে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি আছে এবং এই ঘাঁটিগুলো আমাদের দেশের শিশু ও সাধারণ মানুষকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা চাই না কোনো মুসলিম দেশ বা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক, কিন্তু আত্মরক্ষার জন্য আমরা এই ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করতে বাধ্য হই। আমরা বিশ্বাস করি যে যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো সমাধান হয় না এবং শান্তি ফিরে আসে না; আলোচনার মাধ্যমেই শান্তি ও সমাধান সম্ভব। আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোকে জানিয়ে দিয়েছি যে আমেরিকানরা তাদের সামরিক ঘাঁটি বা হোটেলে যেখানেই থাকুক না কেন, তারা আমাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আমরা এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছি যেন আমেরিকানদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য মাটি ব্যবহার করতে না দেওয়া হয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু বহিঃশত্রুর আক্রমণে আমরা সবাই একতাবদ্ধ। ইমাম খামেনির মৃত্যুর পর দেশে কোথাও আন্দোলন হয়নি। ইরানি জনগণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জাহনাবাদি বলেন, ইরান দীর্ঘ কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুদ রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতা ইরান পাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র বিনিময় থাকলেও কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। সেজন্য তাদের সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয় নেই।

পারমাণবিক হামলার কোনো হুমকি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও দুইবার পারমাণবিক হামলা চালানোর ইতিহাস আছে। এবারও তাদের হামলা চালানোর হুমকি আছে। তবে আমরা সেই ভয়ে থাকব না। ইমাম হোসেন (আ.)-এর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ইরান মাথা নত করার চেয়ে শাহাদাতকে শ্রেয় মনে করে।

খামেনির ওপর রকেট হামলাকে তিনি গোয়েন্দা ব্যর্থতা কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নেতারা সব সময় জনগণের মাঝে থাকেন এবং তাদের ওপর হামলা চালানো কোনো সাহসিকতার পরিচয় নয়, বরং কাপুরুষতা। তিনি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইরাকে যুদ্ধের ময়দানে তাকে কখনো পরাস্থ করতে পারেনি। যখন তিনি একটি আনুষ্ঠানিক সফরে যাচ্ছিলেন তখন যুক্তরাষ্ট্র তাকে চোরাগোপ্তা হামলায় হত্যা করেছিল।

রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে প্রায় সাত হাজার আইএস সদস্যকে ইরাকে স্থানান্তর করেছে এবং তাদের ও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করে ইরানের সীমান্তবর্তী কুর্দিস্তান, কেরমানশাহ ও ইলাম অঞ্চলে হামলা ও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ইরান ইতিমধ্যে ইরাকের কুর্দিস্তানে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী ঘাঁটিতে যেকোনো সময় হামলা চালাতে প্রস্তুত আছে বলেও জানান তিনি।

ইরানে অবস্থান করা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের দূতাবাস সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে এবং কোনো বৈষম্য ছাড়াই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সেখানে অবস্থান করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি জানান, শহীদ ইমাম খামেনির স্মরণে ঢাকাস্থ ইরানি দূতাবাসে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিশেষ শোক বই খোলা হবে। সকাল ১০টা থেকে ১২টা এবং দুপুর ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গসহ সাধারণ মানুষের জন্য শোক প্রকাশের সুযোগ থাকবে।

এই নিউজটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও খবর